কয়েকদিন আগে আমি আমার প্রথম জীবন সম্বন্ধে একটা ছোট প্রবন্ধ লিখেছি। আমি জানতে পেরেছি যে আমার কয়েকজন বন্ধু আমার লেখাটা পড়ে কেঁদেছেন। এছাড়া অনেক বন্ধুরা সে লেখাটা পছন্দ করেছেন ও লেখাটা সম্বন্ধে তাদের অভিমত প্রকাশ করেছেন। আমি তাদেরকে আমার আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। আমার লেখাটা তাদের হৃদয়কে স্পর্শ করেছে জেনে আমি নিজেকে ধন্য মনে করছি। এক সপ্তাহে বাংলাদেশের তিনটা সংবাদপত্র সেই লেখাটা প্রকাশ করেছে। তাই ঠিক করেছি যে আমি এ ধরণের লেখা আরো লিখবো। আমার এই সিদ্ধান্তের তিনটা কারণ। প্রথমত, আমার স্মৃতিশক্তি এখনো ভালো আছে। তাই সময় থাকতে যা কিছু লিখে যেতে পারি তাই লাভ। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নতি হলেও এখনো অনেক লোক চরম দরিদ্রতার ভেতর দিয়ে জীবন যাপন করছে। তারা তুচ্ছ, অবহেলিত এবং ঘৃণিত। তাদের কিছু করা বা বলার সাধ্য নাই। এ ছাড়া কে শুনবে তাদের কথা? আমি তাদের দুঃখ কষ্টের কথা জানি কারণ আমি ছিলাম তাদেরই একজন। আমি এখন কথা বলতে পারি এবং লিখতে শিখেছি । আমি কিছু বললে মানুষ সেটা শুনে। তাই আমার কর্তব্য সেই অসহায় মানুষগুলো সম্বন্ধে কথা বলা। শিক্ষিত ও ধনি লোকদের কাছে আমার অনুরোধ যে তারা যেন এই অসহায় লোকদের সম্বন্ধে তাদের মনোভাব পরিবর্তন করেন এবং তাদের দুঃখ দুর্দশা লাঘব করার চেষ্টা করেন। তৃতীয়ত, যে তরুন তরুণীরা দরিদ্রতার সাথে যুদ্ধ করে লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছে তাদেরকে বলবো, “এই যুদ্ধে তোমাকে জয়ী হতেই হবে। আমি কখনো পরাজয় মেনে নেয়নি, তোমরাও নেবেনা। আল্লাহ ছুহানাহু তা’য়ালা’ তোমাকে সাহায্য করবেন। আমাদের রসূল (স:) যখন বদরের যুদ্ধে প্রায় হেরে গিয়েছিলেন তখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজেল করেছিলেন, ‘আল্লার সাহায্য আসছে। তুমি শীঘ্রই বিজয়ী হবে।’ আমাদের রসূল (স:) বদরের যুদ্ধে বিজয়ী হয়েছিলেন। তুমিও বিজয়ী হবে।” আজ আমি আপনাদেরকে আমার জীবনের প্রথম স্কুল সম্বন্ধে কয়েকটা কথা বলবো।

আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঁচ বছর দর্শনশাস্ত্রে কধ্যাপনা করার পর ক্যানাডায় এসেছি এখন থেকে ৫৩ বছর আগে। মন্ট্রিয়ালের ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি শেষ করে আমি এদেশে অধ্যাপনা করেছি অনেক বছর। মা সা আল্লাহ, আমার ছেলে একজন জগৎ বিখ্যাত কিডনির ডাক্তার এবং আমেরিকার একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট বিভাগের প্রফেসর ও পরিচালক। আমার আমেরিকা ও ক্যানাডার নাতিনাতিরা ভালো স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেছে ও এখনো করছে। আমাদের এই লেখাপড়া শুরু হয়েছিল এখন থেকে ৭৬ বছর আগে বরিশাল জিলার কাশিপুর ইউনিয়নের চহঠা গ্রামের একটা মাটির রাস্তার উপর।

১৯৩৯ শাল। আমার বয়স তখন চার বছর। এক রাতে মৌলভী সাহেব আমাকে হাতেখড়ি দিলেন। পরদিন ভোর ১০টায় পড়াশুনা করার জন্য আমি স্কুলে যাওয়া শুরু করলাম । পরনে একখানা পুরানো গামছা। এ ছাড়া খালি গা ও খালি পা। আমরা ছাত্ররা পাটের তৈরী পুরানো ধানের বস্তার উপর রাস্তার দু’পাশে বসে পরলাম। বর্ণমালা লেখা শুরু করলাম তাল পাতায়। আমাদের কলম ছিল একদিক সরু করা বাশের কঞ্চি। আমরা কালি বানাতাম কাঠ-পোড়া কয়লার পাটা-পুতায় গুঁড়া করা পাউডার দিয়ে। কয়লার গুঁড়ো মাটির দোয়াতে ভিজালে খুব সুন্দর কালি তৌরি হতো।

মৌলভী সাহেব দুই সাড়ির ছাত্রদের মাঝখান দিয়ে হেটে হেটে আমাদের লেখা দেখতেন এবং ভুলত্রূটি সংশোধন করতেন। তার বসার কোনো বন্দোবস্ত ছিলোনা। মাঝে মাঝে চাষীরা যখন তাদের গরুবাছুর নিয়ে আমাদের দুই সাড়ির মাঝখান দিয়ে চলে যেতেন তখন আমাদের শরীর ও চুল ধুলায় সাদা হয়ে যেত। হাস মুরগি গুলিও হেটে হেটে আমাদের কাছে চলে আসতো। বৃষ্টি আরম্ভ হলে অবশ্য আমরা সবকিছু নিয়ে দৌড়িয়ে বাড়ি চলে যেতাম।

স্কুল শেষে আমরা এক লাইনে দাঁড়িয়ে সবাই মিলে উচ্চ কণ্ঠে নামতা পড়তাম। এরপর তালপাতাগুলো ধানের বস্তায় মুড়িয়ে বগলের নিচে করে কালির দোয়াত ও কলমগুলো হাতে নিয়ে বাড়ি চলে যেতাম। বিকেলে আবার আরো তালপাতা সংগ্রহ করতাম ও কয়লা গুঁড়ো করে কালি বানাতাম।
আমি আমার অতীতকে ভুলিনি। আপনারা আমার মন্ট্রিয়ালের বাড়ির বৈঠকখানায় ঢুকলেই মার্বেলের ফায়ার প্লেছের উপর দেখবেন একখানা গামছা, কয়েকটা তালপাতা ও দুটো বাশের কঞ্চির কলম। আপনারা সেখানে আরো দেখবেন দুখানা মাটির খোঁড়া, এবং একটা ছোট বোতল। আমাদের গ্রামের খড়ের রান্নাঘরে মাটির মেঝে একখানা কাঠের পিঁড়ির উপর বসে মাটির তৈরি বাসন অথবা খোৱা থেকে আমি পান্তাভাত খেতাম। অধিকাংশ সময়ই একটা পিয়াজ আর দুই তিনটা পোড়া মরিচ দিয়ে পান্তা ভাত খাওয়া শেষ করতাম। মাটির বাসন ও খোঁড়া খানা রোদে শুকিয়ে শক্ত করে বাংলাদেশ থেকে আনা হয়েছে। আমি মাঝে মাঝে এই খোঁড়া দু’খানা স্পর্শ করে সরাসরি দেশের মাটির স্পর্শ অনুভব করি। বোতলটাতে আছে পবিত্র মাটি : শহীদ মিনারের জমি থেকে আনা কিছুটা মাটি এবং সাভারের স্মৃতি সৌধের ধুলা। এ সবকিছুর উপর দেয়ালে লেখা আছে:
ও আমার দেশের মাটি,
তোমার পরে ঠেকাই মাথা।